বদকার লোকের মৃত্যুর ঘটনা

মৃত্যু এমন এক বাস্তবতা, যা থেকে পৃথিবীর কোনো মানুষই পালিয়ে যেতে পারবে না।মৃত্যু এমন এক চিরন্তন সত্য, যাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। মৃত্যুর সামনে সবাই সমানভাবে অসহায়।দুনিয়ার জীবনে মানুষ নানা ধরনের কাজ করে। 

কেউ আল্লাহর আদেশ মেনে চলার চেষ্টা করে, আবার কেউ  অন্যায়, প্রতারণা, জুলুম ও মানুষের অধিকার নষ্ট করার মতো কাজে লিপ্ত হয়।ইসলাম আমাদের মৃত্যুর ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে, কিন্তু একই সঙ্গে আল্লাহর অসীম রহমতের কথাও স্মরণ করিয়েদেয়।মৃত্যুর মানুষের জিবনের প্রথম ধাপ তার পর মানুষের অসল জীবনবা পথ শুরু।

কোনো নির্দিষ্ট মৃত ব্যক্তির চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট দলিল না থাকলে তাকে নিশ্চিতভাবে জান্নাতি বা জাহান্নামি বলা উচিত নয়। মানুষের বাহ্যিকঅবস্থা দেখে তার অন্তরের অবস্থা কিংবা আখিরাতের চূড়ান বিচার নির্ধারণ করা।

তাই আমাদের উচিত মৃত্যুর আগে সকল খারাপ কাজ থেকে বিরত থেকে নিজের জীবনকে আল্লাহর পথে ব্যয় করা আল্লাহ ক্ষমাশীল।

সূচিপত্র:

মৃত্যু থেকে কেউ পালাতে পারবে না 

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন:“প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কিয়ামতের দিনই তোমাদের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে।” সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, দুনিয়ার জীবন চিরস্থায়ী নয়। একজন মানুষ যত সম্পদশালী হোক না কেনো যত ক্ষমতাবান হোক কিংবা যত বড় পদে অধিষ্ঠিত থাকুক, একদিন তাকে মৃত্যুর বরন করতে হবে।

অনেক মানুষ মনে করে, এখনো তো বয়স কম, সামনে অনেক সময় আছে। পরে নামাজ পড়ব, পরে তওবা করব, পরে ভালো কাজ করব। কিন্তু মানুষের মৃত্যু কখন আসবে, তা কেউ জানে না।কেউ দীর্ঘ জীবন লাভ করে, আবার কেউ অল্প বয়সেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। তাই মৃত্যুর প্রস্তুতি বৃদ্ধ বয়সের জন্য রেখে দেওয়া উচিত নয় ।

পাপাচারী মানুষ কেন মৃত্যুর কথা ভুলে যায়

মানুষের অন্তরে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন এই ভালোবাসা তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তখন সে নিজের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে যাই নিজেকেই আল্লাহর কে শরণ করা থেকে বিরত থাকে।মানুষ ভুলে গেছে পৃথিবী তারা আসল ঠিকানা নয় ।

কেউ সম্পদ অর্জনের জন্য মিথ্যা বলে, কেউ ব্যবসায় প্রতারণা করে, কেউ অন্যের অধিকার নষ্ট করে, আবার কেউ অহংকারের কারণে অন্য মানুষকে তুচ্ছ মনে করে।এ ধরনের আচরণ মানুষকে ধীরে ধীরে অন্যায়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:“যে অণু পরিমাণ সৎকাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে অণু পরিমাণ অসৎকাজ করবে, সে তাও দেখতে পাবে।”— সূরা আয-যিলযাল, ৯৯:৭–৮

 মৃত্যুর সময় মানুষের অনুশোচনা

পবিত্র কুরআনে মৃত্যুর সময় মানুষের অনুশোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য বর্ণিত হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:“অবশেষে যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলে, ‘হে আমার রব! আমাকে ফিরিয়ে দিন, যাতে আমি যে সৎকাজ ছেড়ে এসেছি, তা করতে পারি।’ কখনোই নয়! এটি তো তার একটি কথামাত্র, যা সে বলছে। আর তাদের সামনে রয়েছে বারযাখ, পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।”

— সূরা আল-মুমিনূন, ২৩:৯৯–১০০

এই আয়াত আমাদের সামনে একটি গভীর সত্য তুলে ধরে। দুনিয়ার জীবনে যারা ভালো কাজের সুযোগ পেয়েও অবহেলা করে, মৃত্যুর সময় তারা ফিরে গিয়ে সৎকাজ করার আকাঙ্ক্ষা করতে পারে।কিন্তু মৃত্যুর পর দুনিয়ায় ফিরে এসে নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ দেওয়া হবে না।

এখানে আমাদের জন্য বড় শিক্ষা রয়েছে। আজ যদি নামাজ পড়ার সুযোগ থাকে, তাহলে আজই নামাজ শুরু করা উচিত। কারও কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন হলে আজই ক্ষমা চাওয়া উচিত। কারও পাওনা পরিশোধ করার সামর্থ্য থাকলে তা বিলম্ব না করে আদায় করা উচিত।

মৃত্যুর সময় ফেরেশতাদের আগমন সম্পর্কে কুরআনের বর্ণনা

মৃত্যুর সময় ফেরেশতাদের আগমনের কথা কুরআনে বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:“যদি তুমি দেখতে, যখন ফেরেশতারা কাফিরদের প্রাণ হরণ করে, তাদের মুখমণ্ডল ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করে এবং বলে, ‘দহনযন্ত্রণা আস্বাদন করো!’”— সূরা আল-আনফাল, ৮:৫০

এই আয়াতে অবিশ্বাসীদের মৃত্যুর সময়ের কঠিন অবস্থার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সতর্কবাণী।

তবে এই আয়াতের ভিত্তিতে প্রত্যেক পাপী মুসলমানের মৃত্যুর অবস্থা একই রকম হবে বলে দাবি করা ঠিক নয়। কুফর, পাপ, তওবা এবং আল্লাহর বিচার—এসব বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।কোনো ব্যক্তি জীবনে  ভালো কিছু করতে চাইলে আমাদের উচিত মৃত্যুর আগে সকল খারাপ কাজ থেকে বিরত থেকে নিজের জীবনকে আল্লাহর পথে ব্যয় করা আল্লাহ ক্ষমাশীল।

কবরের জীবন 

মৃত্যুর পর মানুষের জন্য কবরের জীবন শুরু হয়। এটি দুনিয়ার জীবন ও কিয়ামতের মধ্যবর্তী অবস্থিত, কবরের জীবন সম্পর্কে ইসলামে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:কবর হলো আখিরাতের প্রথম মনজিল।

এই হাদিসের শিক্ষা হলো, মৃত্যুর পরের জীবনকে অবহেলা করা উচিত নয়। দুনিয়ায় মানুষ যে জীবন যাপন করে, তা তার আখিরাতের প্রস্তুতির সঙ্গে সম্পর্কিত।তাই দুনিয়ার জীবনে আল্লাহ পাকের যে নিয়ামত সেটা গ্রহণ করা এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ রোজা পালন করে সঠিকভাবে ইসলামের পথে চলে কবরের প্রস্তুতি নেওয়াই  মানুষের আসল উদ্দেশ্য।

সহিহ হাদিসে দুই ব্যক্তির কবরের শাস্তির ঘটনা

আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এসেছে।

একবার রাসুলুল্লাহ ﷺ দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি জানালেন, ওই দুই কবরের অধিবাসীকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। তাদের একজন প্রস্রাব থেকে সতর্কতা অবলম্বন করত না, আর অন্যজন মানুষের মধ্যে চোগলখুরি করে বেড়াত।

এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ একটি তাজা খেজুরের ডাল নিয়ে দুই ভাগ করেন এবং প্রত্যেক কবরের ওপর একটি করে অংশ স্থাপন করেন। সাহাবিরা জানতে চাইলেন, তিনি কেন এমন করলেন। তিনি জানালেন, ডাল দুটি শুকিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত হয়তো তাদের শাস্তি কিছুটা লাঘব করা হবে।

— সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২১৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯২।

এই ঘটনাটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।তাই নিজেকে সবসময় পবিত্রতা রক্ষা এবং ইসলামের পরিচ্ছন্ন ও পবিত্রতা গুরুত্ব মেনে চলা আমাদের সকলের দায়িত্ব তাই আমরা সকল ভুল কাছ থেকে বিরত রেখে আল্লাহর পথে চলবো।

মানুষের অধিকার নষ্ট করার ভয়াবহ পরিণতি

বদকার মানুষের জীবনে একটি বড় সমস্যা হলো মানুষের অধিকারকে অবহেলা করা। কেউ অন্যের টাকা আত্মসাৎ করে, কেউ মিথ্যা অভিযোগ করে, কেউ প্রতারণার মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করে, আবার কেউ কথার মাধ্যমে অন্যকে অপমান করে।

ইসলামে মানুষের অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে ন্যায়বিচার করা এবং তাদের অধিকার রক্ষা করাও জরুরি।

রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোমরা কি জানো নিঃস্ব কে?”

এরপর তিনি এমন ব্যক্তির কথা বলেন, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে আসবে, কিন্তু দুনিয়ায় কাউকে গালি দিয়েছে, কারও ওপর অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ ভোগ করেছে, কাউকে আঘাত করেছে কিংবা হত্যা করেছে। ফলে তার নেকি ক্ষতিগ্রস্তদের দিয়ে দেওয়া হবে। নেকি শেষ হয়ে গেলে তাদের পাপ তার ওপর চাপানো হবে।— সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮১।

পাপের পরিণতি সম্পর্কে সতর্কতা

ইসলাম মানুষকে পাপ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয়। কারণ, পাপ মানুষের আত্মিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে।কিন্তু পাপের পরিণতি সম্পর্কে আলোচনা করার সময় ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। আল্লাহর শাস্তির ভয় যেমন থাকা উচিত, তেমনি তাঁর রহমতের আশাও রাখতে হবে।

কেউ পাপ করেছে বলে তার জন্য ক্ষমার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় না। সে যদি আন্তরিকভাবে তওবা করে, তাহলে আল্লাহর ক্ষমার আশা করতে পারে।মানুষেরা জেনেশুনে অনেক অনেক পাপের জড়িত হয়ে যাচ্ছে ।

তাই সকলের উচিত সব বাদ দিয়ে নিজের পাপের ক্ষমা চাওয়া এবং আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে নিজের খারাপ কাজের জন্য অনুতপ্ত হওয়া। তাই বদকার মানুষের মৃত্যুর আলোচনা শুনে শুধু অন্যকে দোষারোপ না করে নিজের জীবন সংশোধনের করা উচিত।

আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন:

হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”— সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩।

এই আয়াত পাপী মানুষের জন্য আশার বার্তা বহন করে। কেউ যদি অতীতে অনেক ভুল করে থাকে, তবুও তার উচিত আল্লাহর কাছে ফিরে আসা।ক্ষমা চেয়ে নিজের ভুলকে সংশোধন করে নেওয়া এবং আল্লাহপাকের নেয়ামতকে স্বীকার করে নিয়া।

মানুষের উচিত পাপ ছেড়ে দেওয়া, নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে সেই পাপে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা।

আন্তরিক তওবার গুরুত্ব

তওবা হলো পাপ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। ইসলামে তওবার গুরুত্ব অপরিসীম।রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় তোমাদের এমন ব্যক্তির চেয়েও বেশি আনন্দিত হন, যে মরুভূমিতে তার হারানো উট ফিরে পায়।”— সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৪৭।

তওবার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:

পাপটি ছেড়ে দেওয়া।

  1. নিজের ভুলের জন্য আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া।
  2. ভবিষ্যতে সেই পাপে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা।
  3. অন্যের অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা যথাসম্ভব সংশোধন করা।

তওবা শুধু মুখে কিছু শব্দ উচ্চারণ করার নাম নয়। এর সঙ্গে অন্তরের অনুশোচনা এবং জীবনের পরিবর্তনও জড়িত।

মৃত্যুর আগে ভালো কাজ করার সুযোগ

যতক্ষণ মানুষ জীবিত থাকে, ততক্ষণ তার জন্য ভালো কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সে নামাজে যত্নবান হতে পারে, কুরআন পড়তে পারে, দরিদ্রকে সাহায্য করতে পারে, মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে পারে এবং নিজের ভুল সংশোধন করতে পারে।

কেউ যদি দীর্ঘদিন নামাজে অবহেলা করে থাকে, তাহলে তার উচিত আজ থেকেই নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া। কেউ যদি অন্যের সঙ্গে অন্যায় করে থাকে, তাহলে তার উচিত সেই অন্যায় সংশোধনের চেষ্টা করা।মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার জন্য একটি নির্দিষ্ট বয়সের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। আল্লাহর দিকে ফিরে আসার জন্য আজই উপযুক্ত সময়।

মৃত্যুর পরও উপকারী হতে পারে এমন আমল

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বিষয় ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।”

— সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩১।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, কিছু কল্যাণকর কাজের উপকার মৃত্যুর পরও চলতে পারে।যেমন, কেউ মানুষের উপকারে আসে এমন জ্ঞান শিক্ষা দিল, কল্যাণকর কোনো কাজের ব্যবস্থা করল কিংবা নেক সন্তান গড়ে তুলল,এসবের মাধ্যমে উপকারের ধারাবাহিকতা থাকতে পারে।

তাই মানুষের উচিত নিজের জীবনকে শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা। অন্যের উপকারে আসে এমন কাজ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বদকার মানুষের মৃত্যুর গল্প প্রচারের ক্ষেত্রে সতর্কতা

অনেক সময় মানুষের মধ্যে বিভিন্ন গল্প প্রচলিত থাকে। সেখানে বলা হয়, কোনো পাপী ব্যক্তি মৃত্যুর সময় ভয়ংকর কিছু দেখেছে, তার মুখ বিকৃত হয়ে গেছে, তার আত্মা বের হতে চায়নি কিংবা কবরের মধ্যে অমুক ঘটনা ঘটেছে।

কিন্তু এসব ঘটনার পক্ষে নির্ভরযোগ্য দলিল না থাকলে সেগুলোকে সত্য ঘটনা হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।বিশেষ করে ইসলামিক নিবন্ধে হাদিসের নামে কোনো কথা লেখার আগে তার সূত্র যাচাই করা জরুরি। শুধু মানুষের মুখে শোনা গল্প কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যকে সহিহ হাদিস বলা যাবে না।

একটি সত্যনিষ্ঠ ইসলামিক নিবন্ধের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে সঠিক শিক্ষা দেওয়া। ভয় দেখানোর জন্য মিথ্যা ঘটনা তৈরি করা নয়।তাই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করলে তার নির্ভরযোগ্য সূত্র দিতে হবে। সূত্র না থাকলে ঘটনাটিকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

বদকার মানুষের মৃত্যুর আলোচনা থেকে আমাদের শিক্ষা

এই পুরো আলোচনা থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।

প্রথম শিক্ষা: মৃত্যু অবধারিত। তাই মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়া প্রত্যেক মানুষের জন্য জরুরি।

দ্বিতীয় শিক্ষা: পাপকে ছোট মনে করা উচিত নয়। ছোট অন্যায়ও মানুষের জীবনে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তৃতীয় শিক্ষা: মানুষের অধিকার রক্ষা করা জরুরি। কারও সম্পদ, সম্মান কিংবা অধিকার নষ্ট করা উচিত নয়।

চতুর্থ শিক্ষা: তওবার দরজা খোলা থাকা অবস্থায় আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে হবে। পাপ করে হতাশ হওয়া উচিত নয়।

পঞ্চম শিক্ষা: কুরআন ও সহিহ হাদিসের বাইরে বানানো কাহিনি প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

ষষ্ঠ শিক্ষা: অন্যের মৃত্যুর পরিণতি নিয়ে নিশ্চিত মন্তব্য না করে নিজের আমল সংশোধনে মনোযোগ দিতে হবে।

সপ্তম শিক্ষা: আল্লাহর রহমতের আশা এবং তাঁর শাস্তির ভয়—দুটিই অন্তরে রাখতে হবে।

মৃত্যুর প্রস্তুতির জন্য দৈনন্দিন করণীয়

মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য বিশেষ কোনো দিন বা বয়সের অপেক্ষা করতে হয় না। প্রতিদিনের জীবনে কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।

  1. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করার চেষ্টা করা।
  2. প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত করা এবং তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করা।
  3. সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর কাছে দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।
  4. মিথ্যা, গিবত, অপবাদ ও প্রতারণা থেকে দূরে থাকা।
  5. হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা।
  6. মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা।
  7. আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা।
  8. সামর্থ্য অনুযায়ী দান-সদকা করা।
  9. অন্যের পাওনা সময়মতো পরিশোধ করা।
  10. প্রতিদিন নিজের ভুলগুলো পর্যালোচনা করে সংশোধনের চেষ্টা করা।

এই কাজগুলো মানুষের জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করতে সহায়তা করতে পারে।

উপসংহার

বদকার লোকের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে আলোচনা করার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে পাপ থেকে সতর্ক করা, মৃত্যুর বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানানো।

পবিত্র কুরআন আমাদের জানিয়েছে, প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। মৃত্যুর পর মানুষ দুনিয়ায় ফিরে এসে নতুন করে আমল করার সুযোগ পাবে না। সহিহ হাদিসে কবরের শাস্তি, মানুষের অধিকার এবং মৃত্যুর পরও উপকারী হতে পারে এমন আমলের কথা বর্ণিত হয়েছে।

আমাদের উচিত অন্যের পাপ নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি নিজের ভুলগুলো সংশোধন করা। কারও অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া, আন্তরিকভাবে তওবা করা এবং ভালো কাজের মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করা।

মৃত্যু কখন আসবে, তা আমরা জানি না। তাই আজকের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা উচিত।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পাপ থেকে বেঁচে থাকার, আন্তরিকভাবে তওবা করার, মানুষের অধিকার আদায় করার এবং ঈমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ইওর ব্র্যান্ড পয়েন্টস নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url